Inqilab Logo

রোববার, ১৪ জুলাই ২০২৪, ৩০ আষাঢ় ১৪৩১, ০৭ মুহাররম ১৪৪৬ হিজরী

সাহিত্যে বিরহ বেদনা

মুহাম্মদ ফজলুর রহমান | প্রকাশের সময় : ১০ জুন, ২০২২, ১২:০২ এএম

যে কথা মোর রইল বাকী হায় সে কথা শুনাই কারে?/ মাগো আমার প্রাণের কাঁদন আছড়ে মরে বুকের দ্বারে!/যাই তবে মা! দেখা হ’লে আমার কথা ব’লো তারে-/রাজার পূজা-সে কি কভু ভিখারিনী ঠেলতে পারে?/মাগো আমি জানি জানি,/আসবে আবার অভিমানী/খুঁজতে আমায় গভীর রাতে এই আমাদের কুটীর-দ্বারে,/ব’লো তখন খুঁজতে তারেই হারিয়ে গেছি অন্ধকারে!/(কাজী নজরুল ইসলাম)

প্রেমের জন্য রাতের গভীরে অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া, আবার তার ফিরে আসার মনসিক ভরসা এবং আকুল আকুতি প্রকাশ নিজের মায়ের কাছে বা কোন আপন জনের কাছে এটাই বিরহ ব্যথা। যে ব্যথা তাকে ঘরে থাকতে দিল না, সে ব্যথার কাব্যিক প্রকাশই সাহিত্য এবং শুধু বাংলা সাহিত্য-এ নয় বিশ্বের সকল সফল সাহিত্যেই বিরহ ব্যথায় ভরপুর এবং তা পরিপূর্ণ স্বার্থক। লাইলি মজনু, শিরি ফরহাদের বিরহ ব্যথার সাথে রোমিও জুলিয়েটের ব্যথার কাতরতা এবং উর্দূ পারস্য সাহিত্যের সনি-মহিয়ালের ব্যথার কাতরতা, সংস্কৃতি সাহিত্যের মেঘদূত কাব্যের যক্ষের বেদনা বিধুর আবদার বিরহ সাহিত্যকে অমরত্ব দান করেছে।
বাংলা সাহিত্য সম্ভার বিরহ গাঁথা এবং বিয়োগ ব্যথায় ভরপুর। যা পঠকের মনকে নিয়ত আন্দোলিত করে। যে কথা বা সুর স্রোতা বা পাঠকের মনে স্থায়ী আসন লাভ করে তাই স্বার্থক সাহিত্য এবং বিরহ সাহিত্যই পাঠকমনকে গভীরভাবে আপ্লুত করে থাকে। যে কথা পাঠকের মনকে নাড়া দিতে পারে তা স্থায়ী হয়, পাঠকের চিন্তার খোরাক যোগায় ও মনে আনন্দ সৃষ্টি করে। এখানেই সাহিত্যের স্বার্থকতা। মূলত বিরহ সাহিত্যই স্বার্থক সাহিত্য।
ওকি গাড়িয়াল ভাই/কত রব আমি পন্থের দিকে চাইয়া/বিরহিনীর ব্যবুল মনের কাতরতা কার মনকে না আন্দোলিত করে? কবি কীটস বলেছেন, Our sweetest songs are those that tell of saddest thought! সুতরাং ব্যথা কাতর সুর যখন মনের গভীরে পৌঁছে তখন এক অব্যক্ত মর্ম ব্যথায় প্রাণ জুড়ায়। বাংলা সাহিত্যের পরতে পরতে বিরহ ব্যথায় ভরপুর। সামান্য গ্রাম্য বালিকা রতনের বিরহ ব্যথা ( পোস্ট মাস্টার-- রবীন্দ্রনাথ ) শহুরে পোস্টমাস্টারের হৃদয়ে যে ভাবের আবেশ সৃষ্টি করেছিল, তা বিশ্ব কবির বর্ণনায় অমরত্ব লাভ করেছে বাংলা সাহিত্যের ছোট গল্পের ভান্ডারে।
ভালোবাসা মানুষের হৃদয়ে বিশ্ব প্রভুর অনুপম দান। সৃষ্টির মহান উদ্দেশ্য মানবের ভালোবাসায় পরিপূর্ণ হয়। এই ভালোবাসার সফল পরিনতি বা পরিপূর্ণতার পথে যদি বাঁধা আসে এবং সকরুণ পরিনতিতেই যদি ভালোবাসার সমাধি সৃষ্টি হয়। সৃষ্টি হয় বিরহ এবং এই বিরহের কারণে সৃষ্টি হয় অনুপম সাহিত্য। যা নজরুলকে পড়লে বুঝা যায়।
বাংলা সাহিত্য বিরহে ভরপুর। বিরহই বাংলা সাহিত্যকে অমর করে রেখেছে। বিষাদ সিন্ধুর বিয়োগ ব্যথা পাঠকের হৃদয়কে ব্যথাতুর করে এবং ভিন্ন ধরনের রস দেয়, অশ্রু ঝরায়। এখানেই লেখকের স্বার্থকতা ও স্বার্থক সৃষ্টি। বিষাদ সিন্ধুর মত গদ্যসাহিত্য, শরৎ চন্দ্রের অমর উপন্যাস, রবীন্দ্রনাথের কবিতা ও ছোট গল্প, নজরুলের কবিতা ও গদ্য-কাব্য, মধুসূদনের মেঘনাথ বধ কাব্য বাংলা সাহিত্যকে করেছে পরিপূর্ণ। শুধু বাংলা সাহিত্য নয়, পৃথিবীর সকল সাহিত্যই বিরহে ভরপুর।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: সাহিত্যে বিরহ বেদনা
আরও পড়ুন