Inqilab Logo

বুধবার, ১৭ জুলাই ২০২৪, ২ শ্রাবন ১৪৩১, ১০ মুহাররম ১৪৪৬ হিজরী

শেখ ফজলুল করিমের জীবন ও সাহিত্য

জুবায়ের আলী জুুয়েল | প্রকাশের সময় : ৩ মার্চ, ২০২৩, ১২:০০ এএম

বাঙ্গালী মুসলমানদের লুপ্ত গৌরব ও ইতিহাস ঐতিহ্য নিয়ে যে কয়জন খ্যাতনামা মুসলিম সাহিত্যিক স্মরণীয় বরণীয় হয়ে রয়েছেন তাঁদের মধ্যে শেখ ফজলল করিম হলেন অন্যতম।
“কোথায় স্বর্গ কোথায় নরক কে বলে ’ তা বহুদুর,
মানুষের মাঝে স্বর্গ নরক মানুষেতে সুরা সুর।”
কবিতার রচয়িতা কবি শেখ ফজলল করিম কবি শেখ ফজলল করিম লালমনিরহাট জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার কাকিনায় ১৮৮৩ সালের ১’লা মার্চ জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৩৬ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর পিতার নাম আমীর উল্লা সরদার ও মাতার নাম কোকিলা বিবি। শৈশবে কাকিনা স্কুল থেকে ১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দে শেখ ফজলল করিম মধ্য ইংরেজী পরীক্ষায় দ্বিতীয় শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হন। পরবর্তীতে রংপুর জেলা স্কুল থেকে তিনি মাইনর পরীক্ষায় পাশ করেন। ছাত্রাবস্থায় কাকিনা স্কুলে ৭ম শ্রেণীতে পড়ার সময় তাঁর বিয়ে হয় কালীগঞ্জ উপজেলার বিন বিনিয়া গ্রামের গনি মোহাম্মদ সর্দারের মেয়ে বসিরণ নেসা খাতুনের সঙ্গে (মৃত্যু ১৯৬২ খ্রি)। অত:পর নানা কারণে তার স্কুল জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে। দাম্পত্য জীবনে দু’ পুত্রের জনক ছিলেন কবি। তাঁর প্রথম পুত্র মাত্র ৩ দিন জীবিত ছিল। দ্বিতীয় পুত্রের নাম মতিয়ার রহমান। কবি শেখ ফজলল করিম ১৯০১ খ্রিষ্টাব্দে থেকে ১৯০২ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত পাট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান মেসার্স এমভি কোম্পানীতে চাকুরীতে নিয়োজিত ছিলেন। স্বাধীনচেতা ফজলল করিম কোম্পানীর মন যুগিয়ে কাজ করতে না পারায় স্বীয় চাকুরী থেকে স্বেচ্ছায়, পদত্যাগ করেন। ত্রিশের দশকে শেখ ফজলল করিম ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্টও ছিলেন। কর্মজীবনে তিনি মুন্সি মেহেরউল্লাহর (১৮৬১-১৯০৭ খ্রি:) অনুপ্রেরণা ও পরামর্শ পেয়ে ছিলেন। সাহিত্য সৃষ্টি, প্রকাশনা ও সাধনার পথে ধাবমান শেখ ফজলল করিম কাকিনায় নিজ বাড়িতে তাঁর পীর সাহেব হযরত মাওলানা মহম্মদ শাহ সাহাব উদ্দীনের নামানুসারে তৎকালীন প্রায় দেড় হাজার টাকা ব্যয়ে প্রতিষ্ঠিত করেন “সাহাবিয়া প্রিন্টিং ওয়ার্কস”। তিনি শেষ জীবন পর্যন্ত লেখার জগত নিয়ে জীবন অতিবাহিত করেন।
তাঁর সাহিত্যিক জীবনের উন্মেষ ছোট বেলা থেকেই। পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ার সময় তিনি “সরল পদ্য বিকাশ” কবিতা গুচ্ছ প্রকাশ করেন। এরপর থেকে তিনি আজীবন সাহিত্য সেবায় নিয়োজিত ছিলেন। তাঁর সাহিত্যকর্মে ধর্ম ও নীতি শাস্ত্র বিশেষ প্রাধান্য পেয়েছে। নৈতিক আদর্শে সমৃদ্ধ কবিতা ও গদ্য লিখে তিনি প্রভুত সুনাম অর্জন করেন। মুসলিম ইতিহাস, মুসলিম উপাখ্যান, মুসলিম জীবন ইত্যাদি ছিল তাঁর সাহিত্যের মূল উপজীব্য বিষয়, ছাত্রাবস্থায় ১৮৯৬ খ্রিষ্টাব্দে তিনি “আহমেদিয়া লাইব্রেরী” নামক একটি ব্যক্তিগত পাঠাগার নিজ উদ্যোগে গড়ে তুলেছিলেন। স্কুলের বাঁধা ধরা নিয়ম কানুন তাঁর কখনোই ভাল লাগেনি। তবে বাইরের প্রচুর বই অধ্যয়নে তাঁর অনীহা ছিল না। বিশেষ করে ইতিহাস বিষয়ক গ্রন্থের প্রতি তাঁর আকর্ষন ছিল সবচেয়ে বেশি। প্রচুর জ্ঞান পিপাসা ও অনুশীলন তাঁর লেখার জগতকে সমৃদ্ধি করেছে। শেখ ফজলল করিমের সাহিত্যের উপজীব্য বিষয় ধর্মীয় হলেও দৃষ্টিভঙ্গির উদারতা ও সাহিত্যিক প্রসাদ গুনে তাঁর সৃষ্টি সার্বজনীন হয়ে উঠেছে। শেখ ফজলল করিমের পরিচিত মূলত: একজন কবি হিসেবে কিন্তু আমরা দেখি তিনি কবিতা ও কাব্য ছাড়াও লিখেছেন অসংখ্য প্রবন্ধ, নাট্যকাব্য, জীবনী গ্রন্থ, ইতিহাস গনেষণামূলক নিবন্ধ, সমাজ গঠন মূলক তত্ত্বকথা, গল্প, শিশুতোষ সাহিত্য, নীতি কথা, চরিত গ্রন্থ এবং বিবিধ সমালোচনামূলক রচনা, সাহিত্যের সকল শাখায় ছিল তাঁর পদচারণা।
ইসলাম প্রচারক, নবনুর, কোহিনুর, বাসনা, মিহির ও সুধাকর, ভারতবর্ষ, সওগাত, বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা, শিশুসাথী, কল্পতরু, মোসলেম ভারত, সোলতান, মাসিক মোহাম্মদী, আলহক, বসুমতি ইত্যাদি পত্র পত্রিকায় ফজলল করিমের অসংখ্য কবিতা, প্রবন্ধ, নিবন্ধ, উপন্যাস, কাব্য, জীবনী, আলোচনা, সমালোচনা ও অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। সমকালীন মুসলমান কবি সাহিত্যিকদের মধ্যে তাঁর অবস্থান ছিল প্রথম সারিতে। সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজীর (১৮৮০-১৯৩১ খ্রি:) নেতৃত্বে যে নবতর সাহিত্য প্রচেষ্টার উন্মেষ এদেশে ঘটেছিল তাঁর সার্থক ধারক ও বাহক ছিলেন শেখ ফজলল করিম, জীবীতকালেই তিনি পেয়েছেন তাঁর সাহিত্য কর্মের স্বীকৃতি। “পথ ও পাথেয়” গ্রন্থের জন্য তিনি রৌপ্য পদক পান। ১৩২৩ বঙ্গাব্দে নদীয়া সাহিত্য সভা তাঁকে “সাহিত্য বিশারদ” উপাধিতে ভূষিত করে। “চিন্তার চাষ” গ্রন্থের জন্য তিনি লাভ করেন নীতি ভুষণ উপাধি। ১৩৩১ বঙ্গাব্দে খিদিরপুর মাইকেল লাইব্রেরী মধুস্মৃতি কবিতার জন্য তিনি রৌপ্য পদক পান। ১৯৩৪-৩৫ খ্রিষ্টাব্দে বাংলা সরকারের লঁঃব জবংঃৎরপঃরড়হ রৌপ্য পদক তিনি পেয়েছিলেন ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট থাকাকালে। এছাড়াও তৎকালীন বাংলার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাঁকে দিয়েছিল কাব্যভূষণ, সাহিত্যরতœ, বিদ্যাবিনোদ, কাব্যরতœাকর উপাধি ও সম্মান।
শেখ ফজলল করিম কাকিনা থেকে “বাসনা” নামে একটি মাসিক পত্রিকা সম্পাদনা শুরু করেন ১৯০৮ খ্রিষ্টাব্দের মে’ মাসে। “বাসনা” পত্রিকাটি দু’বছর চালু ছিল। সাহিত্যের মাধ্যমে হিন্দু মুসলমান মিলন সম্ভব এটি ছিল তাঁর অভিমত। এই পত্রিকায় হামেদ আলী, শেখ রেয়াজ উদ্দীন আহমদ, মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, তসলিম উদ্দীন আহমদ (রংপুর এর প্রথম মুসলিম গ্রাজুয়েট) এবং আরো অনেক স্বনামখ্যাম ব্যক্তির লেখা প্রকাশিত হতো। ঐ সময় “বাসনা” পত্রিকাটি ছিল পূর্ববঙ্গের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাসিক পত্রিকা। বিভিন্ন সুত্র থেকে শেখ ফজলল করিমের প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত গ্রন্থের তালিকা অনুযায়ী আমরা তার ৫৮ টি রচনার সন্ধান পাই। নীচে শেখ ফজলল করিমের সেই ৫৮টি রচনাবলী ও গ্রন্থের নাম পাঠকদের কাছে তুলে ধরা হল-
(১) সরল পদ্য বিকাশ (বাল্য রচনা), (২) মদন ভস্ম (বাল্য রচনা এবং বিনষ্ট, (৩) মানসিংহ (১৯০৩ খ্রি.), (৪) তৃষ্ণা (কাব্য) ১৯০০ খ্রি., (৫) ছামীতত্ত্ব বা ধর্মসঙ্গীত (১৯০৩ খ্রি.), (৬) পরিত্রাণ (কাব্য) ১৯০৪ খ্রি., (৭) ভগ্নবীণা বা ইসলাম চিত্র (১৯০৪ খ্রি.), (৮) লাইলি মজনু (১৯০৪ খ্রি.), (৯) মহর্ষি খাজা মইন উদ্দীন চিশতি (রা.) জীবণী (১৯০৪ খ্রি.), (১০) মহর্ষি ইমাম রব্বানী মোজাদ্দাদে-আল ফসানী (১৯০৫ খ্রি.), (১১) আফগানিস্তানের ইতিহাস (১৯০৯ খ্রি.), (১২) ভক্তি পুষ্পাঞ্জলী (১৯১১ খ্রি.), (১৩) গাঁথা (১৯১৩ খ্রি.), (১৪) চিন্তার চাষ (১৯১৬ খ্রি.), (১৫) হারুন-অর-রশিদের গল্প (১৯১৬ খ্রি.), (১৬) সোনার বাতি (১৯১৮ খ্রি.), (১৭) বিবি রহিমা (১৯১৮ খ্রি.), (১৮) পথ ও পাথেয় (১৯১৮ খ্রি.), (১৯) জোয়ার ভাটা (১৯১৮ খ্রি.), (২০) রাজর্ষি এবরাহিম (১৯২৫ খ্রি.), (২১) বিবি খাদিজা (১৯২৭ খ্রি.), (২২) বিবি ফাতেমা (১৯২৭ খ্রি.), (২৩) মাথার মনি (১৯২৮ খ্রি.), (২৪) প্রেমের স্মৃতি (কোহিনূর পত্রিকায় প্রকাশিত), (২৫) উচ্ছাস, (২৬) রাজর্ষি মহিমা রঞ্জন (রঙপুর সাহিত্য পরিষৎের পত্রিকায় প্রকাশিত), (২৭) মহর্ষি হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রা.), (২৮) পয়গাম্বরগণের কাহিনী, (২৯) কমলা দেবী, (৩০) হারানো ধন, (৩১) গোলেস্তান, (৩২) মানিক জোড় (শেখ সাদী ও ফরিদ উদ্দীন আক্তারের পান্দনামার অনুবাদ), (৩৩) একেশ্বরবাদ (বাসনা পত্রিকায় প্রকাশিত), (৩৪) ছেলেদের সেক্সপিয়র, (৩৫) বাগ ও বাহার (মীর কাশিমের দুই পুত্রের করুণ কাহিনী, বসুমতি পত্রিকায় প্রকাশিত), (৩৬) ত্রিস্রোতা (তিস্তাপাড়ের মুসলিম জীবন কাহিনী), (৩৭) মুন্সী মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ সাহেবের স্বর্গারোহনে মর্মগাঁথা (সোলতান পত্রিকায় প্রকাশিত), (৩৮) প্রতিদান (উপন্যাস-সওগাত ১৩২৫ অগ্রহায়ণ সংখ্যায় প্রকাশিত), (৩৯) বিবি আয়েশা, (৪০) মোহাম্মদ চরিত, (৪১) বেহেস্তের ফুল (পুণ্যময়ী মুসলিম মহিলাদের জীবনী), (৪২) চাঁদ বিবি (আহমদাবাদের রানীর জীবনী, সওগাত পত্রিকায় প্রকাশিত), (৪৩) পথের আলো, (৪৪) প্রতিশোধ (পায়রাবন্দ জমিদার পরিবারের কাহিনী অবলম্বনে লেখা সামাজিক উপন্যাস। নূর লাইব্রেরী, কলকাতা থেকে ছাপা হওয়ার পর দপ্তরিখানা থেকে বিনষ্ট হয়ে যায়), (৪৫) পান্থশালা, (৪৬) পরশমনি, (৪৭) ওমর খৈয়ামের অনুবাদ (সওগাতে প্রকাশিত), (৪৮) যীশু খ্রিষ্টের জীবনী সমালোচনা, (৪৯) আল হারুণ, (৫০) পৌত্তলিকতার পরিমান ও একেশ্বরবাদ, (৫১) কান্তনামা (সম্পাদিত পুথি), (৫২) রাজা মহিমারঞ্জনের পশ্চিম ভ্রমণ, (৫৩) চমচম (ছোটদের কবিতা, আশরাফ সিদ্দীকি সম্পাদিত ছোটদের কবিতা নামে ১৯৬২ সালে সম্পাদিত), (৫৪) হাতেম তাই এর গল্প, (৫৫) আমার জীবন চরিত (তরুণ বয়সে রচনা), (৫৬) রাজা মহিমারঞ্জন শোকগাঁথা, (৫৭) সরদার বংশ চরিত, (৫৮) মুন্সী মেহেরুল্লাহ শোকগাঁথা।
কবির স্বর্গ ও নরক নামের কালজয়ী কবিতাটি ১৩২১ বঙ্গাব্দের আষাঢ় সংখ্যা ভারতবর্ষে প্রকাশিত হয়েছিল। কবির এই কবিতাটি “বঙ্গবানী” ও কবি “মালঞ্চ” নামক দুটি স্কুল পাঠ্যপুস্তকে ও গৃহীত হয়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা সিলেবাসে ম্যাট্রিক ক্লাশের জন্য তাঁর কবিতা পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভূক্ত হয়েছে।
“কোথায় স্বর্গ, কোথায় নরক?” বিখ্যাত কবিতার কবি হিসেবে সমগ্র বাংলাদেশে তিনি আজও সুপরিচিত। লালমনিরহাট তথা বাংলার গৌরব শেখ ফজলল করিমের অনেক পান্ডুলিপি কলকাতার নুর লাইব্রেরীতে প্রকাশের অপেক্ষায় ছিল। সেগুলো কোথায় আমরা তা জানিনা। খোঁজ করলে হয়তো কবির আরও অনেক রচনার সন্ধান পাওয়া যাবে। নবীন গবেষকদের এ ব্যাপারে এগিয়ে আসার উদাত্ত আহবান জানাই।
১৯০৯ খ্রিষ্টাব্দের ১ এপ্রিল (১৩০৫ বঙ্গাব্দের ২০ চৈত্র) কাকিনার রাজা মহিমা রঞ্জনের মৃত্যু হয়। তিনি ছিলেন রঙ্গপুর সাহিত্য পরিষদের আজীবন সভাপতি। তার মৃত্যুর পর ১৩১৬ বঙ্গাব্দের ১৭ আষাঢ় তারিখে রংপুর জেলা স্কুলে জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট মি, জে. ভাসের সভাপতিত্বে রঙ্গপুর সাহিত্য পরিষদের উদ্যোগে একটি স্মৃতি সংরক্ষণ সভার বিশেষ অধিবেশন হয়। ঐ অধিবেশনে শেখ ফজলল করিম পাঠ করেছিলেন তাঁর লেখা “রাজর্ষি মহিমা রঞ্জন” নামক এক দীর্ঘ প্রবন্ধ। এটি পরবর্তীতে ঐ বছর (১৯০৯ খ্রি.) কলকাতা মেটকাফ প্রেস থেকে গধযরসধ জধহলধহ ঝধৎধংধিঃ ইযধাধহ নামক পুস্তিকায় ছাপিয়ে প্রকাশ করেছিল “রঙ্গপুর সাহিত্য পরিষৎ”। সে প্রবন্ধে শেখ ফজলল করিমের ভাষা ছিল----
“লোকে বলে রাজা মহিমা রঞ্জনের মৃত্যু হইয়াছে। সত্যিই কি তাই ? আমি বলি ইহা সম্পূর্ণ সত্য কথা নহে। মহিমা রঞ্জনের নশ্বর অংশটুকু লোক লোচনের বহির্ভূত হইয়াছে সত্য কিন্তু প্রকৃত মহিমা রঞ্জন কি বিলয় হইতে পারেন ? দেশের অস্থি-মজ্জায়, যাহার দয়া-দান ও উপচিকীর্ষা জড়িত হইয়া আছে, জনসাধারণের হৃদয় সিংহাসনে যাহার অমর স্মৃতি চির জাগ্রত রহিয়াছে, তাহার কি মৃত্যু সম্ভব। আমরা তাঁহার স্মৃতি রক্ষার জন্য যতই যাহা করিনা কেন, আমাদের হৃদয় রাজ্যে তাঁহার যে সুউচ্চ স্মৃতি স্তম্ভ উত্থিত রহিয়াছে, তাহার নিকট সকল স্মৃতি ক্ষণভঙ্গুর।
পল্লী বাংলার নিভৃত কোণে শেখ ফজলল করিম নিরলসভাবে সাহিত্য সাধনা ও জ্ঞানচর্চা করেছেন। দীর্ঘ রাত পর্যন্ত তিনি জেগে থাকতেন। কখনো হঠাৎ ঘুম থেকে জেগে ওঠে পেন্সিল দিয়ে হাতের কাছে পাওয়া যেকোন কাগজে লিখে রাখতেন মনের মধ্যে উত্থিত ভাবের কথা। বিছানায় তাঁর সাথে পেন্সিল ও পেন্সিল কাটার ছুটি থাকতো সবসময়। আশেপাশের জ্ঞান পিপাসু মানুষেরা প্রায়ই তাঁর সাথে আলোচনায় প্রবৃত্ত হতেন। এদিক থেকে তিনি ছিলেন বিশেষ ধরণের মানুষ যার ছিল জ্ঞান আদান প্রদানের মহৎ ভাবনা। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি গজলের ভক্ত ছিলেন। নিজেও বেশ কিছু বাংলা গজল লিখেছেন।
উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমদিকে অবিভক্ত বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রে বাঙ্গালী মুসলমানদের অবস্থান মোটেও সুদৃঢ় ছিলনা। ব্রিটিশ ভারতে তৎকালীন সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা ছিল সুস্থ মননশীল সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে বড় অন্তরায়। কবি শেখ ফজলল করিম সে সময়ে কবি বা গদ্য লেখক হিসেবে তিনি তাঁর সাহিত্যের মাধ্যমে সুপরিচিত হয়েছিলেন। এটা তাঁর অসীম কৃতিত্বের পরিচয়।
লালমনিরহাট তথা বাংলার গৌরব শেখ ফজলল করিমের অনেক পান্ডুলিপি কলকাতার নূর লাইব্রেরীতে প্রকাশের অপেক্ষায় ছিল। সেগুলো কোথায় আমরা তা জানিনা। খোঁজ করলে হয়তো কবির আরো অনেক রচনার সন্ধান পাওয়া যাবে। নবীন গবেষকদের এ ব্যাপারে এগিয়ে আসার উদাত্ত আহবান জানাই।
বরেন্য কবি ও সাহিত্যিক শেখ ফজলল করিম ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দের ২৮ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে শেখ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন। কাকিনায় নিজ ভবনে তিনি চিরশায়িত আছেন।
তাঁর কবর সাহাবিয়া প্রিন্টিং প্রেসের অবদান, ব্যবহৃত জিনিসপত্রাদি এবং নানা স্মৃতিচিহ্ন আমরা দেখতে পাই কবি বাড়িতে। সংরক্ষনের অভাবে এগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। নানা আশ্বাস, নানা প্রতিশ্রুতি এবং নানা উদ্যোগ সত্বেও কবি বাড়িতে কিংবা কাকিনায় তাঁর সম্পর্কে গবেষণা করার ক্ষেত্র কিংবা স্মৃতি রক্ষার সমন্বিত আয়োজন আমরা লক্ষ্য করিনা। যেটুকু হয়েছে তা উল্লেখযোগ্য নয়। তাঁর ৮০ তম মৃত্যুবার্ষিকীতে (১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দের ২৮ সেপ্টেম্বর মৃত্যু) তাঁকে জানাই হৃদয়ের অফুরন্ত ভালোবাসা।
অবিভক্ত বাংলার রংপুরের গৌরবোজ্জল কবি শেখ ফজলল করিমের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে আমরা কী বৃহত্তর রংপুর অথবা নিজ জন্মভূমি লালমনিরহাটের কাকিনায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় তাঁর নামকরণে করতে পারিনা ? এটি সমগ্র রংপুরবাসীর প্রাণের দাবী।
মৃত্যুর পূর্বে শেখ ফজলল করিম তাঁর নিজের জন্য কবিতা লিখে রেখে গেছেন-
আর্দ্র মহীতলে হেথা চির-নিদ্রাগত
ব্যাথাতুর দীন কবি, অফুরন্ত সাধ,
ভূলে যাও ত্রুটি তার জনমের মত,
হয়তো সে করিয়াছে শত অপরাধ।
পান্থ পদরেণু পুত্র এ শেষ ভবন,
হতে পারে তার ভাগ্যে সুখের নন্দন।
কবি মনে করেছিলেন মধুসূদনের সমাধি ফলকের উৎকীর্ণ কবিতার মতো উক্ত কবিতাটির হয়তো বা লেখা থাকবে তাঁরও সমাধিতে। মৃত্যুর ৮৬ বৎসর পরও কি আমরা তাঁর শেষ ইচ্ছাটি পূরণ করতে পারিনা ?



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন