পবিত্র লাইলাতুল বরাত
আজ দিবাগত রাত পবিত্র লাইলাতুল বরাত। পরম করুণাময় আল্লাহতায়ালা তার বান্দাদের গুনাহ মাফ, বিপদমুক্তি ও
প্রস্তাবিত তিস্তা মহাপ্রকল্পে চীনা বিনিয়োগ ও বাস্তায়নের রূপরেখা যখন এগিয়ে চলেছে, ঠিক তখন আবারো তিস্তার পানিচুক্তির মূলা ঝুলিয়ে প্রকল্পটিকে বাধাগ্রস্ত করার কথা শোনা যাচ্ছে। আগামী মার্চের শেষদিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরে আসার কথা রয়েছে। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতিদের বাংলাদেশ সফরের আগে বহু কাক্সিক্ষত তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে কথা ওঠে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তিস্তাচুক্তি স্বাক্ষরে ভারতের কাছে বার বার আহবান জানিয়েও কোনো ফল পাওয়া যায়নি। সফরকারী ভারতীয় রাষ্ট্রনেতারা নানা অজুহাত দেখিয়ে বছরের পর বছর পার করে দিয়েছেন। ওদিকে খরিপ মওসুমে পানির অভাবে তিস্তাপাড়ের বির্স্তীণ এলাকা বালুময় ধুঁধুঁ মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। দেশের বৃহত্তম তিস্তা সেচপ্রল্পের অধিকাংশ এলাকা পানির অভাবে মুখ থুবড়ে পড়েছে। নদীতে পানি সংকটের কারণে ভূগর্ভস্থ পানির উপর অধিকমাত্রায় নির্ভরশীল হওয়ায় পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে। দেশের কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা, অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের উপর চরম প্রভাব দেখা দিয়েছে। তিস্তার উজানে গজলডোবা বাঁধ নির্মাণ করে শুকনো মওসুমে ব্যাপকহারে পানি প্রত্যাহার করে এসব ঝুঁকি সৃষ্টি করা হয়েছে। আবার বর্ষা মওসুমে বাঁধের গেটগুলো খুলে দিয়ে পানিধারণ ক্ষমতা হারিয়ে ফেলা নদীকে বন্যা ও ভাঙ্গনের মুখে ঠেলে দেয়া হয়েছে। এভাবেই তিস্তাপাড়ের কোটি কোটি মানুষ ভারতের খামখেয়লিপনায় চরম দুর্ভোগের সম্মুখীন হয়েছে। এখন প্রস্তাবিত তিস্তা মহাপ্রকল্প তিস্তাপাড়ের ৫-৭টি জেলার মানুষের জন্য নতুন আশার আলো হয়ে দেখা দিয়েছে।
আন্তজার্তিক নদী হিসেবে গঙ্গা বা তিস্তার পানির উপর ভারত একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। দশকের পর দশক ধরে তথাকথিত আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়ে ভারত যৌথ নদীগুলোর উপর বাঁধ ও সংযোগ খাল নির্মাণ করে পানি প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। এটা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারতের সুস্পষ্ট পানি আগ্রাসন। এ আগ্রাসন মোকাবেলায় ভারতকে পানিবণ্টন চুক্তিতে উপনীত হওয়া এবং চুক্তি অনুসারে পানির হিস্যা আদায় করা ছাড়াও পানি সংরক্ষণ এবং নদীব্যবস্থাপনায় বিকল্প উদ্যোগের কথাও বরাবরই উঠে এসেছে। এ ক্ষেত্রে ফারাক্কা ব্যারেজের বিপরীতে গঙ্গাবাঁধ নির্মাণের প্রস্তাবও বহু পুরনো। রহস্যজনক কারণে তা বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। ভারতের বাঁধা এবং এ দেশের ভারতের প্রতি অন্ধ অনুগত নেপথ্য কুশীলবদের কারণেই তা সম্ভব হচ্ছে না বলে সাধারণ মানুষের ধারণা। তিস্তা ব্যারেজ নির্মাণের পরিকল্পনাও কোনো নতুন বিষয় নয়। পাকিস্তান আমলেই এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রস্তাব উঠেছিল।
অনেক দেরিতে হলেও সরকার তিস্তার পুনরুজ্জীবন ও অববাহিকার কৃষি, জীববৈচিত্র্য ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় একটি মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। এ জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আমরা আন্তরিক অভিনন্দন জানাই। উল্লেখ্য, সরকার ইতোমধ্যে শতবর্ষ মেয়াদি ডেল্টা প্রকল্পও গ্রহণ করেছে। তিস্তা মহাপ্রকল্প সেই প্রকল্পের একটি অংশ হিসেবেই সমন্বয় করে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। তিস্তা নদীর বাংলাদেশ অংশের ১১৩ কিলোমিটার অববাহিকার পুরো এলাকা নিয়েই ‘তিস্তা রিভার কমপ্রিহেন্সিভ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেস্টোরেশন’ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ এগিয়ে চলেছে সরকার। চীন সরকার এ প্রকল্পে এক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব নিয়ে এগিয়ে এসেছে। ইতোমধ্যে প্রাথমিক সমীক্ষাও শেষ করেছে। এখন উন্মুক্ত দরপত্র আহবান করে কাজ শুরু করতে পরিকল্পনা বিভাগের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছে বলে জানা যায়। অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকে বলতে চাই, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে চীনা প্রস্তাব গ্রহণে সময় ক্ষেপণের কোনো সুযোগ নেই। তিস্তা পানি চুক্তি যখনই হয় হোক, তার জন্য অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। পানি চুক্তি ও আলোচ্য তিস্তা মহাপ্রকল্প একে অপরের বিকল্পও নয়। এ প্রকল্প সম্পূর্ণ বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। পানিবণ্টন চুক্তির সঙ্গে এর কোনো সম্পর্কও নেই। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সফর বা সম্ভাব্য তিস্তা চুক্তির মুলা ঝুলিয়ে তিস্তা মহাপ্রকল্পের গতিকে বাধাগ্রস্ত করার যে কোনো প্রয়াস সতর্কতার সাথে এড়িয়ে যেতে হবে। প্রকল্পের আওতায় যে বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু হবে তা দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সামগ্রিক চিত্রপট বদলে দেবে। আট হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নের পর বছরে অন্তত ২০ হাজার কোটি টাকার ফসল উৎপাদন বৃদ্ধির সম্ভাব্যতার কথা জানা যাচ্ছে। নদীভাঙ্গন রোধ, বালু অপসারণ করে নতুন ফসলি জমি উদ্ধার চর ও শত কিলোমিটার নদী খনন করে নদীতে পানি ধারণ ক্ষমতাবৃদ্ধি, দুইপাড়ে নতুন টাউনশিপ গড়ে তোলার মতো উদ্যোগ রয়েছে এই প্রকল্পে। টেন্ডার জটিলতা ও কালক্ষেপণ হয় এমন সব পন্থা এড়িয়ে চীনা কোম্পানির সাথে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার বিষয়টি ভেবে দেখা যেতে পারে। যত দ্রুত সম্ভব এ প্রকল্পের বাস্তবায়ন হোক, এটাই সকলের প্রত্যাশা।
দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।