Inqilab Logo

রোববার, ২১ এপ্রিল ২০২৪, ০৮ বৈশাখ ১৪৩১, ১১ শাওয়াল ১৪৪৫ হিজরী

মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনার উদ্যোগ নেই

এবি সিদ্দিক | প্রকাশের সময় : ৫ মার্চ, ২০২৩, ১২:০১ এএম

মুদ্রাস্ফীতি বলতে বোঝায় পণ্য ও সেবার দাম বেড়ে যাওয়াকে। যা সাধারণত ঘটে অতিরিক্ত মুদ্রা সরবরাহের কারণে। সহজ ভাষায় বললে, একটি দেশের বাজারে পণ্যের মজুদ এবং মুদ্রার পরিমাণের মধ্যে ভারসাম্য থাকতে হয়। যদি পণ্যের তুলনায় মুদ্রার সরবরাহ অনেক বেড়ে যায় অর্থাৎ দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক অতিরিক্ত মাত্রায় টাকা ছাপায় তখনই মুদ্রাস্ফীতি ঘটে। এর ফলে একই পরিমাণ পণ্য কিনতে আগের চাইতে বেশি মুদ্রা খরচ করতে হয়। যেমন, গত বছর ২০ কেজি চাল কিনতে খরচ হতো ১ হাজার টাকা। চলতি বছর সেই একই পরিমাণ চাল কিনতে খরচ পড়ছে ১ হাজার ৫০ টাকা। অর্থাৎ বছরের ব্যবধানে ৫০ টাকা বা ৫ শতাংশ বেশি টাকা লাগছে। এই ৫ শতাংশ হলো মুদ্রাস্ফীতির পরিমাণ। এর মানে টাকার মানও ৫ শতাংশ কমে গিয়েছে। এভাবে একটি নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে বিভিন্ন পণ্য ও সেবার দামের পরিবর্তন হিসাব করে মুদ্রাস্ফীতি পরিমাপ করা হয়। মুদ্রাস্ফীতি যদি ওই দেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধির চেয়ে কম থাকে তাহলে সেটার তেমন নেতিবাচক প্রভাব থাকে না। সাধারণত ২ থেকে ৫ শতাংশ মুদ্রাস্ফীতি থাকলে সেটাকে সহনীয় বলা যায়। ৭ থেকে ১০ শতাংশ হলে মধ্য ও নিম্নবিত্ত আয়ের মানুষের কষ্ট বেড়ে যাবে। এবং এর চাইতে বেশি মুদ্রাস্ফীতি পুরো দেশের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তবে হাতে গোনা কয়েকটি পণ্য ও সেবার মূল্য বাড়লেই সেটাকে মুদ্রাস্ফীতি বলা যাবে না। যদি সামগ্রিকভাবে পণ্য ও সেবার মূল্য বাড়ে তাহলেই বুঝতে হবে মুদ্রাস্ফীতির কারণে এমন হয়েছে।

মুদ্রাস্ফীতির প্রধান কারণ হল মুদ্রার সরবরাহ বেড়ে যাওয়া। আরও কিছু কারণ রয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও যুদ্ধের কারণে পণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহ বাধাগ্রস্থ হয় ফলে সংকট দেখা দেয়, যার প্রভাব দামে গিয়ে পড়ে। এছাড়া যুদ্ধে লিপ্ত রাষ্ট্রগুলো যুদ্ধে বিনিয়োগের জন্য প্রচুর অর্থ ছাপিয়ে থাকে, সেটাও মুদ্রার সরবরাহ বাড়িয়ে দেয়। বাজারে যদি কোন পণ্য ও সেবার চাহিদা বেড়ে যায় এবং সে অনুযায়ী সরবরাহ না থাকে, তখন দাম বেড়ে যায়। আবার কোনও জিনিস তৈরি করতে যে সামগ্রী লাগে তার দাম বাড়লেও মূল পণ্যের দাম বেড়ে যায়। আবার একটি দেশের জনসংখ্যা অনুপাতে পণ্য ও সেবা সরবরাহ পর্যাপ্ত না থাকলেও দামে এর প্রভাব পড়ে। দেশের অর্থনীতি প্রবলভাবে নির্ভরশীল জ্বালানি তেলের ওপর। কারণ যেকোনো পণ্য গ্রাহকের কাছে পৌঁছায় পেট্রোল বা ডিজেলে চালিত যানবাহনের মাধ্যমে। ফলে এই তেলের দামের প্রভাব সব পণ্যের ওপরেই কমবেশি পড়ে। সম্প্রতি ইউক্রেনে যুদ্ধ পরিস্থিতির একটা বড় প্রভাব পড়েছে জ্বালানি তেলের ওপর। মুদ্রাস্ফীতির ফলে সাধারণ মূল্যস্তর এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পায়। মুদ্রাস্ফীতির সময় অর্থের যোগান বৃদ্ধি পাওয়ায় সমাজের ব্যয়োপযোগী আয়ের পরিমাণ বেড়ে মোট চাহিদা বৃদ্ধি পায়। চাহিদা বৃদ্ধির তুলনায় জিনিসপত্রের পরিমাণ বৃদ্ধি না পাওয়ায় দ্রব্য মূল্যের বৃদ্ধি ঘটে। তাই মুদ্রাস্ফীতি যদি দীর্ঘকাল স্থায়ী হয় তাহলে শ্রমিকরা অধিক মজুরি দাবি করে। মুদ্রাস্ফীতির সময় শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি পায় এবং সে সাথে যন্ত্রপাতি ও কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি পায়। এর ফলে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে দ্রব্যমূল্য আরও বেড়ে যায়।

মুদ্রাস্ফীতির ফলে যে সাধারণ দামস্তর বৃদ্ধি পায় তাতে সমাজে ধনী শ্রেণী অপেক্ষা দরিদ্র শ্রেণীর লোকেরা ক্ষতিগ্রস্থ হয়। মুদ্রাস্ফীতির সময় ধনীরা আরও ধনী হয় এবং দরিদ্ররা আরও দরিদ্র হয়। এভাবে মুদ্রাস্ফীতির সময় সমাজের আয় বৈষম্য বৃদ্ধি পায়। ফলে সামাজিক অস্থিরতার সৃষ্টি হয়। মুদ্রাস্ফীতির সময় শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যে অসন্তোষ বৃদ্ধি পায়। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির ফলে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় শ্রমিকেরা মজুরি বৃদ্ধির জন্য দাবি করে। এর ফলে অনেক সময় শ্রমিক আন্দোলন, ধর্মঘট এবং অন্যান্য রকমের শ্রমিক-মালিক বিরোধ এবং সামাজিক অশান্তির সৃষ্টি হয়। তাছাড়া মুদ্রাস্ফীতির সময় এক শ্রেণীর লোক অধিক মুনাফার আশায় চোরাচালান, দ্রব্যের কৃত্রিম অভাব সৃষ্টি, কালোবাজারি প্রভৃতি অসামাজিক কার্যকলাপে লিপ্ত হয়। ফলে সামাজিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় ঘটে। মুদ্রাস্ফীতি দেশের অর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। সরকার যদি বিভিন্ন কারণে বেশি করে মুদ্রা ছাপাতে শুরু করে, এতে বাজারে মুদ্রার আধিক্য দেখা যায়। অথচ, জিনিসপত্রের যোগান না বাড়ায় পণ্য ও সেবার দাম বেড়ে যায়। একটি দেশের সরকার সাধারণত বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে খরচ করার জন্য বৈদেশিক ঋণ নিয়ে থাকে এবং সেই মুদ্রা যখন দেশের বাজারে আসে অথচ পণ্যের সরবরাহ আগের মতোই থাকে, তখন সেটার প্রভাবেও মুদ্রাস্ফীতি দেখা দেয়।

ব্যাংকগুলো সুদের হার কমিয়ে দিলে, মানুষ প্রচুর ঋণ নিতে শুরু করে। এতে বাজারে মুদ্রার সরবরাহ বেড়ে যায়। এতে মুদ্রাস্ফীতি ঘটে। সরকার বিভিন্ন খাতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত ভর্তুকি দিলে কিংবা সরকার খরচ বাড়ালে সেই টাকা জনগণের পকেটে আসে। এর প্রভাবে জিনিষপত্রের দাম বেড়ে যায়। মজুরি বা বেতন বৃদ্ধিও মুদ্রাস্ফীতির বড় কারণ। সাধারণত মানুষের হাতে অতিরিক্ত অর্থ চলে আসলে তাদের পণ্য ও সেবার চাহিদা বাড়ে। আগেই বলা হয়েছে যে, একটি দেশের মূল্যস্ফীতি ২ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে সীমিত থাকা উচিত। তা-না হলে সেদেশের অর্থনীতিতে বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ। ইতোমধ্যেই তার মূল্যস্ফীতি ১২ শতাংশ ছাড়িয়েছে। মূল্যস্ফীতিকে অর্থনীতিবিদেরা ‘নীরব ঘাতক’ বলে থাকেন। তার যথার্থ যুক্তি রয়েছে। মূল্যস্ফীতির কারণে একদিকে নিত্যপণ্য ও সেবার মূল্য বেড়ে যায়, অন্যদিকে প্রকৃত আয় কমে যাওয়ায় খাদ্য-শিক্ষা-চিকিৎসার মতো অপরিহার্য ব্যয় থেকে কাটছাঁট করতে বাধ্য হন বেশির ভাগ মানুষ। মূল্যস্ফীতির প্রবণতা অব্যাহত থাকলে অনিবার্যভাবেই জীবনযাত্রার মান পড়ে যায়।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য থেকেই দেখা যাচ্ছে, গত মে মাসের পর মূল্যস্ফীতি ৯-এর নিচে নামেনি। উচ্চ মূল্যস্ফীতির এই চাপে দেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষেরা যখন দিশাহারা, তখন জ্বালানি ও বিদ্যুতের মতো কৌশলগত পণ্যের ওপর ভর্তুকি তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ফলে দফায় দফায় বাড়ছে জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম। নতুন বছরের শুরুতে বিদ্যুতের দাম দুই দফা বাড়ার পর এ মাসের শুরুর দিনটাতে বিদ্যুতের সেবা মূল্য আরেক দফা বেড়েছে। একই দিনে রান্নার গ্যাস এলপিজির দাম একলাফে বেড়েছে ২৬৬ টাকা এবং শিল্প, বিদ্যুৎ ও বাণিজ্যিক খাতে গ্যাসের বাড়তি দাম কার্যকর হয়েছে। ফলে নতুন মাসের শুরুতেই ভোক্তার ঘাড়ে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মূল্যবৃদ্ধির বোঝা এসে চাপল। প্রশ্ন হলো অব্যাহত মূল্যস্ফীতিতে এমনিতেই চিড়েচ্যাপটা হওয়া নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা নতুন এই চাপ কতটা নিতে সক্ষম হবে? মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনার কোনো উদ্যোগ নেই।

লেখক: সাংবাদিক।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন