Inqilab Logo

রোববার, ২৬ মে ২০২৪, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১, ১৭ জিলক্বদ ১৪৪৫ হিজরী

শীতে খেজুরের রস খাই

| প্রকাশের সময় : ৩০ ডিসেম্বর, ২০২২, ১২:০০ এএম

শীতকালের ঠান্ডার মধ্যে কাঁচা খেজুরের রস খেতে পছন্দ করেন অনেকে। কেউ আবার এ রসকে প্রক্রিয়াজাত করে পিঠা-পুলি, পায়েস, গুড় তৈরি করে খেয়ে থাকেন। সারা বছর খেজুরের রস সংগ্রহ করা যায়। তবে শীতকালের খেজুরের রসই বেশি সুস্বাদু। শীত কমার সঙ্গে সঙ্গে রসের পরিমাণ ও মানও কমতে থাকে।
খেজুরের রস প্রচুর খনিজ ও পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ। বাংলাদেশে যে খেজুর হয় তাতে যথেষ্ট শাঁস থাকে না বলে অনেকেই এটা খেতে খুব একটা পছন্দ করেন না। তাই খেজুরের রসই আসল আকর্ষণ। খেজুরের রস থেকে তৈরি গুড় অনিদ্রা ও কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। খেজুরের গুড়ে আয়রন বা লৌহ বেশি থাকে এবং হিমোগ্লোবিন তৈরিতে সহায়তা করে। শারীরিক দুর্বলতা কাটিয়ে কর্মস্পৃহা ফিরিয়ে আনতে খেজুরের রস দারুণ উপকারী। খেজুরের রস প্রচুর খনিজ ও পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ। এতে ১৫-২০% দ্রবীভূত শর্করা থাকে, যা থেকে গুড় ও সিরাপ উৎপাদন করা হয়। খেজুরের গুড় আখের গুড় থেকেও বেশি মিষ্টি, পুষ্টিকর ও সুস্বাদু। ঘ্রাণ ও স্বাদের জন্য এ গুড়ের রয়েছে বিশেষ চাহিদা। খেজুরের গুড়ে আখের গুড়ের চেয়ে বেশি প্রোটিন, ফ্যাট ও মিনারেল রয়েছে। সকালের নাশতায় খেজুর রসের সিরাপ দিয়ে রুটি খেলে বেশ তৃপ্তি পাওয়া যায়।

> খেজুরের রসের উপকারিতা-
খেজুর রসে সরল শর্করা বা ফ্রুক্টোজ ও গ্লুকোজ থাকে প্রায় ১৫-২০%। এই মিশ্রিত শর্করার সাথে প্রচুর খনিজ লবণ ও মিনারেল থাকে। এত উপকারী উপাদান একসাথে উত্তম অনুপাতে মেশানো থাকে ফলে এটি যেকোন কৃত্রিম এনার্জি ড্রিংকস এর চাইতে বেশি ভালো ও স্বাস্থ্যকর।

রক্ত স্বল্পতা দূর করে খেজুর রস ঃ রসে লৌহ বা আয়রন সুপ্ত অবস্থায় থাকে যদি রস জ্বাল করে গুড় বা লালি তৈরি করা হয় তবে এতে প্রচুর আয়রন থাকে। রক্তস্বল্পতা দূর করতে প্রতিদিন এক টুকরা গুড় বা এক চামুচ লালি খাওয়া উচিৎ। বাংলাদেশে খেজুর গুড়ের পিঠা খাওয়া বেশ প্রচলিত তাই বিপুল জনগোষ্ঠীর মোটামুটি ১/৫ অংশ এই শীতকালে রক্তস্বল্পতার হাত থেকে রক্ষা পায়।

পেশিকে মজবুত কওে ঃ পেশির স্বাভাবিক কার্যকারিতা সচল রাখতে পটাসিয়াম ও সোডিয়াম বেশ কার্যকর ভূমিকা রাখে। খেজুরের রসে প্রচুর পরিমানে পটাশিয়াম ও সোডিয়াম থাকে তাই রস বা গুড় পেশীকে শক্তিশালী করে। পেশির অসারতা দূর করতেও এটি কাজ করে। স্নায়ুকোষ পরস্পর যুক্ত থাকে নিউরন নামের সংযোগ স্থলে। এই স্থান দিয়ে অনুভূতির সংকেত চলাচল করে। পটাশিয়াম ও সোডিয়াম স্নায়ু সংকেত চলাচলে প্রধান ভূমিকা রাখে।

ক্লান্তিভাব দূর কওে ঃ ম্যাগনেসিয়াম এর ঘাটতির কারণে আমাদের অবসন্ন বা ক্লান্তি ভাব আসে। রসে রয়েছে প্রচুর ম্যাগনেশিয়াম এটি পান করলে ক্লান্তি ভাব দূর হয় এবং দেহের সজীবতা ফিরে আসে।

হাড় মজবুত কওে ঃ খেজুর রসের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ক্যালসিয়াম। এটি হাড় ও পেশি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। হাড়ের প্রধান উপাদান ক্যালসিয়াম এর অভাব দূর করে খেজুর রস।

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় ঃ রসে প্রচুর এন্টিঅক্সিডেন্ট থাকে এটি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সৃষ্টি করে। দেহের ক্ষতিকর উপাদান বের করে দেয়।

ভিটামিনের অভাব দূর করে ঃ রসে ভিটামিন বি-৩ থাকে এটি রক্ত উৎপাদন ও ইমিউন সিস্টেম কে সাহায্য করে। ভিটামিন সি কোষের বর্জ্য পদার্থ দূর করে। সর্দিকাশির হাত থেকে বাঁচায়।

ওজন কমাতে সাহায্য কওে ঃ রসের মিষ্টি স্বাদের কারণ অশোধিত চিনি এটি ধিরে ধিরে রক্তে মিশে যায় ফলে দেহে চর্বি কম জমে। কিন্তু সাধারণ চিনি দ্রুত রক্তে মেশে তাই চিনির খুব ভালো বিকল্প হতে পারে খেজুরের রস। রসে পর্যাপ্ত পটাশিয়াম থাকায় এটি বিপাক ক্ষমতা বাড়ায় ফলে অতিরিক্ত চর্বি দেহে কম জমে এতে ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকে।

কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে ঃ রসে প্রচুর ফাইবার বা আঁশ থাকে এটি মলের পরিমাণ বাড়ায় এবং মল নরম করে ফলে রস কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে কার্যকরী ভূমিকা পালন করে থাকে। খেজুর গুড় একই কাজ করে। এটি অনিদ্রা দূর করতেও সাহায্য করে।

হজম ক্ষমতা বাড়ায় ঃ রস আমাদের হজমে অংশগ্রহণকারী এনজাইম গুলির ক্ষরণ ও কাজের ক্ষমতা বৃদ্ধি করে ফলে খাবার তাড়াতাড়ি হজম হয়। খাওয়ার পর সামান্য পরিমাণ রস বা গুড় খেলে হজম তাড়াতাড়ি হবে।

> খেজুর রসের অপকারিতা-
যাদের ডায়াবেটিস আছে তাদের খেজুর রস না খাওয়াই ভালো কারণ এর ভেতর থাকা চিনি ডায়াবেটিস এর সমস্যা বাড়িয়ে দিতে পারে।

কিডনি রোগী খেজুর রস পান করলে সমস্যা হতে পারে। রসের পটাসিয়াম কিডনির সমস্যা সৃষ্টি করে।
রক্তের সমস্যা আছে এমন রোগীর রস না খাওয়া উচিৎ।

হাপানী বা অ্যাজমা আছে এমন রোগীর ঠান্ডা রস পান করা উচিৎ নয় এতে শ্বাসকষ্ট বেড়ে যেতে পারে।
বাদুড় রস পান করে রসের হাড়ি থেকে আর বাদুড়ের মুখ থেকে নিপাহ ভাইরাস সহ বিভিন্ন রোগের জীবাণু ছড়িয়ে পরে রস পান করার মাধ্যমে।

> কখন খাবেন, কখন খাবেন না ঃ খেজুরের রস ভোরবেলায় খাওয়া ভালো। সারা রাত ধরে রস জমে থাকার পর সকাল সকাল এ রস খেলে উপকার পাওয়া যায়। তবে সময় যত গড়াতে থাকে, তত এতে ফারমেন্টেশন বা গাঁজন প্রক্রিয়া হতে থাকে। এতে রসের স্বাদ নষ্ট হয় এবং অম্লতা বাড়ে। অন্ধকারে এই প্রক্রিয়া কম হয়, কিন্তু দিনের আলোতে গাঁজন বেশি হয়। তাই দিনের বেলা রস খাওয়া ঠিক নয়। এতে বমিসহ পেটের নানা সমস্যা হতে পারে। খেয়াল রাখতে হবে, খেজুরের রসে যেন কোনো পোকামাকড় মুখ না দেয়। বাদুড় বা পাখির মুখ দেওয়া রস খেলে রোগ হতে পারে।

> কতটুকু রস খাবেন:- একজন সুস্থ মানুষ সকালে এক থেকে দুই গ্লাস রস খেতে পারেন। সকালে খালি পেটে খেলেও সমস্যা নেই। যেহেতু এটি এনার্জি ড্রিংক, তাই শরীরে শক্তি জোগাতে পরিমাণমতো রস খাওয়া ভালো।

> কীভাবে খাবেন:- রাতে বা সকালে রস খেতে পারেন বা রসের তৈরি বিভিন্ন খাবার খেতে পারেন। তবে রস যেহেতু খোলা অবস্থায় গাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়, তাই এতে জীবাণু থাকতে পারে। এটা অস্বাস্থ্যকর। এ জন্য রস হালকা আঁচ দিয়ে বা ফুটিয়ে নিয়ে খাওয়া ভালো। এ ছাড়া রস জ্বাল দিয়ে বিভিন্ন খাবার তৈরি করে খেতে পারেন।

> খেজুর রস খাওয়ার আগে কিছু সাবধানতা-
খুব সকালবেলা সূর্যের তাপ বেড়ে যাওয়ার আগেই রস পান করা উচিৎ। রসের হাড়ি অবশ্যই যেন জাল বা কাপড় দিয়ে ঢাকা থাকে এই বিষয়টি খুব মনোযোগ সহকারে লক্ষ্য করতে হবে। বাদুড় হাড়ির ভিতর মুখ ঢুকিয়ে রস খায়। এ থেকে নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই খেজুরের রস ফুটিয়ে খাওয়া বেশি নিরাপদ।

ষ মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ
প্রতিষ্ঠাতা, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি
কলাম লেখক ও গবেষক
মোবাইল: ০১৮২২-৮৬৯৩৮৯
ইমেইল: [email protected]



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন