Inqilab Logo

রোববার, ১৪ জুলাই ২০২৪, ৩০ আষাঢ় ১৪৩১, ০৭ মুহাররম ১৪৪৬ হিজরী

ভালো মানুষের পরিচয়

আবদুল কাইয়ুম শেখ | প্রকাশের সময় : ৩ নভেম্বর, ২০২২, ১২:০০ এএম

(পূর্বের প্রকাশিতের পর)
বয়স্ক নেককার: আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মানুষকে সৃষ্টি করেছেন তাঁর ইবাদত-বন্দেগি করার জন্য। সৎকর্ম সম্পাদন করার জন্য। অসৎকর্ম হতে নিবৃত্ত থাকার জন্য। মহান আল্লাহ মানুষের সামনে দুটি পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। একটি পথ সৎকর্মের। আর অন্য পথটি অসৎকর্মের। যারা সৎকর্ম সম্পাদন করেন তারা ভালো মানুষ। পক্ষান্তরে যারা অসৎকর্ম নিষ্পন্ন করে তারা মন্দ মানুষ। আল্লাহ তাআলা কাউকে হায়াত বেশি দিয়েছেন এবং কাউকে কম। যে মানুষ বেশি হায়াত পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভালো কাজ করেছেন তিনি নিশ্চয়ই ভালো মানুষ। পক্ষান্তরে বেশি হায়াত পাওয়ার পর যে ব্যক্তি নিজের জীবনটাকে পাপ-পঙ্কিলতায় প‚তিগন্ধময় করে নিয়েছে তাকে ভাল মানুষ বলা যায় না। সে একজন মন্দ মানুষ। বয়স বেশি হওয়ার কারণে তার মন্দত্ব ও পাপ পঙ্কিলতাও বেশি। যে ব্যক্তির আমলনামা সুন্দর ও সৎকর্মে ভরপুর সে একজন ভালো মানুষ। ‘হজরত আবু হুরায়রা রা. বলেন, একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে ভালো ব্যক্তির কথা বলব না কি? সাহাবাগণ বললেন, ‘জি হাঁ, আল্লাহর রাসুল!’ তিনি বললেন, ‘তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে ভালো ব্যক্তি সে-ই, যে তোমাদের মধ্যে বয়সে বেশি এবং নেক কাজে উত্তম।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ৭২১২)
ভালো ও মন্দ : হিংসা, বিদ্বেষ, অহংকার ও পরশ্রীকাতরতা কোন কল্যাণ বয়ে আনে না। যে ব্যক্তি অন্তরে হিংসা, বিদ্বেষ, অহংকার ও পরশ্রীকাতরতা লালন করে তার মধ্যে কল্যাণ কামনা স্থান লাভ করতে পারে না। সে মানুষের ক্ষতি করার জন্য উদগ্রীব থাকে। এমন মানুষকে ভালো মানুষ বলা যায় না। ভালো মানুষ তারাই যারা মানুষের কল্যাণকামী ও হিতাকাঙ্ক্ষী। ভালো মানুষ তাকেই বলা যায় যার ক্ষতি হতে নিরাপদ থাকা যায়। যার অনিষ্ট থেকে বেঁচে থাকা সম্ভব হয়। ‘হজরত আবু হুরায়রা রা. বলেন, কোন এক সময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বসে থাকা কয়েকজন লোকের পাশে এসে দাঁড়িয়ে বললেন, তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে ভালো কে এবং সবচাইতে মন্দ কে তা কি আমি তোমাদের জানিয়ে দেব? বর্ণনাকারী বলেন, সকলেই চুপ করে রইল। তারপর তিনি ঐ কথা তিনবার জিজ্ঞেস করেন। তারপর এক ব্যক্তি বলল, হাঁ, আল্লাহর রাসুল! আমাদেরকে জানিয়ে দিন, কে আমাদের মধ্যে সর্বাধিক ভালো এবং কে সর্বাধিক মন্দ। তিনি বললেন, সেই লোক তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে ভালো যার নিকট কল্যাণ কামনা করা যায় এবং যার ক্ষতি হতে মুক্ত থাকা যায়। আর সেই লোক তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে মন্দ যার নিকট কল্যাণের আশা করা যায় না এবং যার ক্ষতি হতেও নিরাপদ থাকা সম্ভব হয় না।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ২২৬৩)
সঙ্গীর দৃষ্টিতে উত্তম : দূর থেকে কোন মানুষকে ভালো মনে হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু এই মনে হওয়ার তেমন কোন ম‚ল্য নেই। কেননা দ‚র থেকে কোনো মানুষকে ভালোভাবে পরখ করে দেখা সম্ভব হয় না। কাছ থেকে একজন মানুষকে যতটুকু যাচাই-বাছাই করে দেখা সম্ভব হয় দ‚র থেকে ততটুকুই যাচাই-বাছাই করা কোনক্রমেই সম্ভব নয়। কোন ব্যক্তির সঙ্গী কিংবা প্রতিবেশী একজন মানুষকে যতটা পরখ করতে পারে, যাচাই-বাছাই করতে পারে, দ‚রের মানুষ ততটা যাচাই-বাছাই ও পরখ করতে পারে না। সঙ্গী বা প্রতিবেশীর কাছে মানুষের চাল-চলন ও আচার-আচরণ খুব সহজেই ধরা পড়ে। তাই কোনো ব্যক্তির ব্যাপারে যদি তার সঙ্গী বা প্রতিবেশি ভালো হবার সাক্ষ্য দেয় ও উত্তম হবার মন্তব্য করে, তাহলে এই সাক্ষ্য ও মন্তব্যের ম‚ল্য রয়েছে। যে ব্যক্তি তার সঙ্গী ও প্রতিবেশীর দৃষ্টিতে ভালো সে প্রকৃত অর্থেই ভালো। কেননা তাকে অত্যন্ত কাছ থেকে নিরীক্ষণ করেই এই সাক্ষ্য দেওয়া হয় ও মন্তব্য করা হয়। হজরত আবদুল্লাহ ইবনু আমর রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন আল্লাহ তাআলার নিকট সঙ্গীদের মাঝে ভালো সঙ্গী হলো সেই ধরনের ব্যক্তি যে তার নিজ সঙ্গীর নিকট ভালো। আল্লাহ তাআলার দৃষ্টিতে প্রতিবেশীদের মাঝে শ্রেষ্ঠ হলো সেই ধরনের প্রতিবেশী যে তার নিজের প্রতিবেশীর নিকট শ্রেষ্ঠ।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ১৯৪৪)
স্ত্রীর কাছে উত্তম : পৃথিবীতে একজন মানুষ তার স্ত্রীর সঙ্গে যত সময় অতিবাহিত করে অন্য কারো সঙ্গে তত সময় অতিবাহিত করে না। স্ত্রী তার স্বামীকে যত কাছ থেকে নিরীক্ষণ করার সুযোগ পায় অন্য কেউ তাকে তত কাছ থেকে নিরীক্ষণ করার সুযোগ পায় না। স্ত্রী স্বামীর ভালো-মন্দ সকল কাজ অত্যন্ত কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করতে পারে। স্বামী ভালো কাজ করলেও স্ত্রী দেখতে পায়, আবার মন্দ কাজ করলেও দেখতে পায়। তাই স্ত্রীর কাছে যদি কোন ব্যক্তি ভালো বলে প্রমাণিত হয়, তাহলে প্রকৃত অর্থেই সেই লোকটিকে ভালো বলা যায়। পক্ষান্তরে স্ত্রীর কাছে যদি কোন ব্যক্তি মন্দ বলে সাব্যস্ত হয়, তাহলে প্রকৃত অর্থেই সেই লোক মন্দ বলে গণ্য হয়। হজরত আয়েশা রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের মাঝে সে-ই ভালো যে তার পরিবারের নিকট ভালো। আর আমি আমার পরিবারের নিকট তোমাদের চেয়ে ভালো। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ৩৮৯৫)
ভালোবাসার পাত্র হওয়া : মানুষ মানুষকে ভালোবাসে। এই ভালোবাসার পেছনে ক্রিয়াশীল থাকে আদব-আখলাক, স্বভাব-চরিত্র ও সুন্দর শিষ্টাচার। যদি কোন ব্যক্তি আদব-আখলাক, স্বভাব-চরিত্র ও সুন্দর শিষ্টাচারের গুণে গুণান্বিত হয়, তাহলে লোকেরা তাকে ভালোবাসে ও প্রশংসা করে। যারা লোকদের আন্তরিক ভালোবাসা ও প্রশংসা পায় তারা সত্যিই ভালো মানুষ। কেননা মন্দ ও চরিত্রহীন মানুষকে কেউ কখনো ভালোবাসে না। নিঃস্বার্থভাবে এমন লোকের প্রশংসা কেউ করে না।
তাই ভালো মানুষ তাদেরকেই বলা যায় যারা মানুষের আন্তরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও প্রশংসার পাত্র হতে পারে। হজরত জাবের রা. বলেন, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মুমিন ব্যক্তি এমন যে সে অন্য লোকদের কে ভালোবাসে এবং অন্য লোকেরাও তাকে ভালোবাসে। এমন ব্যক্তির মধ্যে কোন কল্যাণ নেই যে কাউকে ভালোবাসে না এবং অন্যের ভালোবাসার পাত্র হতে পারে না। মানুষের মধ্যে ভালো মানুষ হলো সেই ব্যক্তি যে লোকদের জন্য অধিকতর উপকারী। (মুজামে আওসাত, হাদিস : ৫৭৮৭) আলোচ্য প্রবন্ধের মাধ্যমে আমরা কুরআন-হাদিসের নিরিখে ভালো মানুষের পরিচয় জানতে পেরেছি। তাই আসুন! সকলেই ভালো মানুষ হওয়ার প্রাণান্তকর প্রয়াস চালাই।

লেখক : শিক্ষক, জামিয়া ইসলামিয়া ইসলামবাগ, চকবাজার, ঢাকা-১২১১

 

 

 



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ