Inqilab Logo

সোমবার, ০৪ মার্চ ২০২৪, ২০ ফাল্গুন ১৪৩০, ২২ শাবান সানি ১৪৪৫ হিজরী

হুমকিতে খাদ্য নিরাপত্তা

নকল ও নিম্নমানের বীজে কৃষকের সর্বনাশ ফলন বিপর্যয়ে ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নিম্নমানের বীজ সরবরাহকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা : কৃষিমন্ত্রী মানসম্পন্ন বীজের জন্য বীজ প্রত

রফিক মুহাম্মদ | প্রকাশের সময় : ৭ মার্চ, ২০২৩, ১২:০০ এএম

দেশে কমেছে জমি, বাড়ছে মানুষ। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদাপূরণের জন্য উৎপাদন বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। আর উৎপাদন বা ফলন বৃদ্ধির মূখ্য বা প্রধান উপকরণ হচ্ছে বীজ। কৃষি উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে উন্নত জাত ও মানের বীজের গুরুত্ব অপরিসীম। কৃষিবিদদের মতে মানসম্পন্ন বীজ ব্যবহারে শতকরা ১৫ থেকে ২০ ভাগ উৎপাদন বৃদ্ধি করা সম্ভব। অথচ দেশে নকল ও নিম্নমানের বীজে বাজার সয়লাব। খোদ সরকারি প্রতিষ্ঠান কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের সরবরাহ করা বীজও নিম্নমানের বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া একশ্রেণির অসাধু মুনাফাখোর বীজ ব্যবসায়ী ভারতীয় নিম্নমানের বীজ বিক্রি করছে। এ ছাড়া ভারতীয় হাইব্রিড জাতের বীজের মোড়ক নকল করে দেশি জাতের নকল বীজও অনেকে বিক্রি করছে। এসব নকল ও নিম্নমানের বীজ ব্যবহার করে নিঃস্ব হচ্ছে অনেক কৃষক। হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে জমিতে নিম্নমানের বীজ বপনের পর তাতে কাক্সিক্ষত ফলন হচ্ছে না। নিম্নমানের বীজে কিনে প্রতারিত হয়ে কৃষকের যেমন সর্বনাশ হচ্ছে, তেমনি ফলন ভালো না হওয়ায় হুমকিতে পড়ছে দেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা।

জানা যায়, কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত বীজ কেউ বাজারে বিক্রি করতে চাইলে জেলা বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সির প্রত্যয়নপত্র লাগে। আবেদনের প্রেক্ষিতে তদন্ত সাপেক্ষে প্রত্যয়নপত্র দেয়া হয়। সেক্ষেত্রে বাজারে বিক্রি করতে আনা বীজের মান যাচাই-বাচাই করা হয়। কিন্তু জেলা বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সির কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজসে বাজারে নকল ও নিম্নমানের বীজ বিক্রি হচ্ছে বলে ভুক্তভোগিদের অভিযোগ।

কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, নিম্নমানের বীজের বিষয়ে এখনো অনেক অভিযোগ আসে। মাঠ থেকে খবর পাই যে, চারা অর্ধেক গজায়নি। এখনো কিছু কোম্পানির প্রতারণা করার প্রবণতা আছে। অনেক সময় কৃষকরা নিম্নমানের বীজ কিনে প্রতারিত হন। এতে একদিকে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়, অন্যদিকে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বীজ কোম্পানিগুলোকে সততার সঙ্গে কাজ করতে হবে। নিম্নমানের বীজ বিক্রি করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ভালো ফলন ও উৎপাদনশীলতার জন্য মানসম্পন্ন বীজ অপরিহার্য। কাজেই বীজের মানের বিষয়ে কোনো রকম ছাড় দেয়া হবে না। কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের মানসম্পন্ন বীজ নিশ্চিত করতে কঠোরভাবে মনিটরিং করতে হবে।

বাংলাদেশে বীজ উৎপাদন ও সরবরাহের সর্ববৃহৎ সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি)। বিএডিসি ও বেসরকারি কোম্পানি/বীজ ডিলার ও এনজিও অনুমোদিত জাতের ভিত্তি, প্রত্যায়িত ও মানঘোষিত শ্রেণির বীজ উৎপাদন করে কৃষক পর্যায়ে সরবরাহ করে। বাংলাদেশ সিড অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসএ) তথ্যমতে, দেশে এখন বছরে সাড়ে ১২ লাখ টন বীজের প্রয়োজন। বর্তমানে মোট বীজের ৫৩ শতাংশই সরবরাহ করে বেসরকারি খাত। ধান বীজের ৪৪ শতাংশ, হাইব্রিড ধানের ৯৭ শতাংশ, ভুট্টার ৯৯ শতাংশ, সবজি বীজের ৮৬ শতাংশ, আলু বীজের ৭৪ শতাংশ, পাট বীজের ৮৩ শতাংশ বীজ সরবরাহ করে বেসরকারি বিভিন্ন কোম্পানি।

বিএডিসির সদস্য পরিচালক (বীজ ও উদ্যান) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বিএডিসি বীজের চাহিদার জোগান বাড়াতে কাজ করছে। পাশাপাশি পরিকল্পনাও হাতে নিয়েছে। আগামী ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১ লাখ ৭২ হাজার টন বীজ উৎপাদন করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে যা এর আগের বছরের চেয়ে বেশি। আমাদের দেশের কৃষকরা অনেক অভিজ্ঞ। তারাও ভালো মানের বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণ করতে পারছেন। রবি ফসলের উৎপাদন বাড়াতে বিনামূল্যে বীজ সহায়তা দেয় কৃষি মন্ত্রণালয়। এবার ৬৪ জেলার ১৬ লাখ ৭০ হাজার ৫০০ কৃষক এ সুবিধা পান। বীজ বাবদ এবার ব্যয় হয়েছে ৮০ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এ ছাড়া বোরো ধানের হাইব্রিড (এসএল-৮এইচ) জাতের বীজ ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়াতে কৃষকদের মাঝে বিনামূল্যে ৮১ কোটি ৭৫ লাখ টাকার বীজ দেওয়া হয়। এর বাইরেও নানাভাবে দেয়া হয় বীজ। এসব প্রণোদনার বীজই এখন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষকের দুশ্চিন্তার কারণ।

চলতি বছর শতীতকালীন রবি মৌসুমে সরকারের প্রণোদনার বীজ যা বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) থেকে সরবরাহ করা হয় তা ছিল নিম্নমানের। এসব বীজ ব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষক ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বিশেষ করে পেঁয়াজের নিম্নমানের বীজে ভালো ফলন না হওয়ায় দিশেহারা কৃষক। বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার ১২টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার ১ হাজার ২০০ কৃষকের মাঝে বিনামূল্যে সবজি বীজ বিতরণ করে উপজেলা কৃষি বিভাগ। কিন্তু বীজে চারা গজায়নি বলে কৃষকদের অভিযোগ। সবজি লাগানোর মৌসুম শেষ হয়ে যাওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তারা।

ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের কৃষক নিম্নমানের পেঁয়াজের বীজ বপন করে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাদের পেঁয়াজ খেতের চারা মরে গেছে। কৃষকরা বলছেন, উপজেলার সারুটিয়া, বগুড়া, মনোহরপুর, আউশিয়া, হরিহরা, সাতগাছিয়া, মৌকুড়ি, ভাটই, দুধস্বর, তামিনগর, ধাওড়া, পাইকপাড়া, বিজুলিয়া, দামুকদিয়া, মহিষাডাঙ্গাসহ বেশ কিছু এলাকায় মাঠে কয়েক হাজার বিঘা জমিতে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়।

কুষ্টিয়ার কুমারখালীর যদুবয়রা ইউনিয়নের খড়িলার বিলের কৃষক তারিকুল ইসলাম দুই বিঘা জমিতে পেঁয়াজের চাষ করেছিলেন। কৃষি বিভাগ থেকে তাকে এক কেজি বীজ সহায়তা দেওয়া হয়। ভেবেছিলেন পেঁয়াজ বিক্রি করে ভালো আয় হবে। কিন্তু তার সেই আশা শেষ হয়ে গেছে। বীজতলা থেকে জমিতে রোপণের পর পেঁয়াজের গাছ শুকিয়ে গেছে। চারাও অনেক কম হয়েছে। আর যে সব চারা হয়েছে সেগুলোও মরে গেছে। পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার মদনপুরা ইউনিয়নের চন্দ্রপাড়া গ্রামের চাষি সেলিম হাওলাদার এ বছর কৃষি অফিস থেকে এক কেজি সরিষাবীজ নিয়ে ৮০ শতাংশ জমিতে বপন করেছিলেন। কিন্তু অর্ধেকের বেশি বীজ থেকে চারা গজায়নি। একই অবস্থা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের চাষিদের। নিম্নমানের বীজের কারণে বিনামূল্যে কৃষকের বীজ পাওয়ার আনন্দ পরিণত হয় নিরানন্দে।

গতবছর রোপা আমন মৌসুমে মুনাফাখোর বীজ ব্যবসায়ীরা কৃষকদের কাছে জনপ্রিয় র্স্বণা জাতের ভারতীয় একটি ধান বীজের নামে দেশীয় বিভিন্ন ধান বীজ বিক্রি করে প্রতারণা করেছে। অথচ স্বর্ণা নামে বাংলাদেশে কোনো ধান নেই। ওই মুনাফাখোর বীজ ব্যবসায়ীরা ভারতীয় ধান বীজ প্যাকেটের আদলে নকল প্যাকেট তৈরি করে বাজার থেকে ধান ক্রয় করে প্যাকেটজাত করছে। পরে তা স্বর্ণা ধানের বীজ হিসেবে বাজারে বিক্রি করছে। বিভিন্ন নামকরা কোম্পানির মোড়কে নিম্নমানের ধান বীজ প্যাকেটজাত করে স্থানীয় হাট-বাজারে বিক্রি হয়। ফলে কৃষক না জেনে এসব নকল বীজ কিনে প্রতারণার শিকার হন। এতে ধানের ফলনে ধস নামে এবং কাক্সিক্ষত খাদ্য উৎপাদন ব্যহত হয়। ফলে খাদ্য উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ সম্ভব হয়নি। ডিলারের প্রতারণায় ভুল জাতের ধানের বীজ বপন করে ক্ষতিগ্রস্ত হন পটুয়াখালী জেলার রাঙ্গাবালীর কয়েকশ’ কৃষক। আমনের মৌসুমে বপন করা এসব বীজে সময়ের আগেই গজিয়েছে ধানের শীষ। যা অপরিপক্ব হওয়ায় অধিকাংশতেই হয়েছে চিটা। ফলন বিপর্যয়ে সর্বনাশ হয় কৃষকের।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সাধারণ কৃষকের সরলতার সুযোগে ‘স্বর্ণ গোটা ও বিআর ১১’ জাতের বীজের কথা বলে বিদেশি জাতের বীজ দিয়েছে খুচরা ডিলাররা। আমনের মৌসুমে বপন করা এসব বীজে অসময়ে ধানের শীষ গজিয়েছে। এতে ধানের চেয়ে চিটাই বেশি। যেখানে প্রতি একর জমিতে ৪০ থেকে ৫০ মণ ধান হওয়ার কথা, সেখানে ৮/১০ মণ ধানও হয়নি। সর্বস্ব হারিয়ে পথে বসেছেন অনেকেই।

বাংলাদেশ সিড অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসএ) উপদেষ্টা সাবেক কৃষি সচিব আনোয়ার ফারুক বলেন, মানসম্মত বীজ ছাড়া কৃষিতে ভালো ফলন সম্ভব নয়। একটি জমিতে ফসল বাড়বে কি কমবে, তার মূল বিষয় হলো কোয়ালিটি বীজ। বীজ উন্নত না করতে পারলে ফলনবৃদ্ধির কোনো সম্ভাবনা থাকবে না। তবে বীজ ব্যবসাকে শক্তিশালী করার জন্য সিড সার্টিফেকেশন এজেন্সিকে আরও সচেতন হতে হবে। নিম্নমানের নকল বীজ শুধু যে কৃষকদের ক্ষতিগ্রস্ত করছে তাই নয়। নিম্নমানের নকল বীজের কারণে কাঙ্খিত ফলন হচ্ছে না। এতে দেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ছে। তার মানে নিম্নমানের বীজ পুরো দেশকে বিপদের মধ্যে ফেলছে।



 

Show all comments
  • Md Shohagh ৭ মার্চ, ২০২৩, ৮:২৯ এএম says : 0
    সব ধরনের খাদ্য কি এই দুই দেশ থেকে আসে পৃথিবীর আর দেশগুলো কি করে নাকি শুধু অজুহাত দেখানো হচ্ছে
    Total Reply(0) Reply
  • Mahamuda Poly ৭ মার্চ, ২০২৩, ৮:২৯ এএম says : 0
    আধুনিকতা সভ্যতা ও সুন্দর সমাজ গড়তে ইসলামী অনুশাসনই যথেষ্ট,,
    Total Reply(0) Reply
  • Abdul Qaiyum Mollik ৭ মার্চ, ২০২৩, ৮:২৯ এএম says : 0
    এর জন‍্য দায়ি পশ্চিমা বিশ্ব, আমেরিকা ও ইউরোপের দেশগুলো পৃথিবিকে নরক বানিয়ে তুলছে। আজকের পৃথিবীর খাদ‍্য সংকটের জন‍্য দায়ি আমেরিকা ও ইউরোপের দেশগুলো।
    Total Reply(0) Reply
  • Mahamuda Poly ৭ মার্চ, ২০২৩, ৮:২৯ এএম says : 0
    আধুনিকতা সভ্যতা ও সুন্দর সমাজ গড়তে ইসলামী অনুশাসনই যথেষ্ট,,
    Total Reply(0) Reply
  • Md Shohagh ৭ মার্চ, ২০২৩, ৮:২৯ এএম says : 0
    সব ধরনের খাদ্য কি এই দুই দেশ থেকে আসে পৃথিবীর আর দেশগুলো কি করে নাকি শুধু অজুহাত দেখানো হচ্ছে
    Total Reply(0) Reply
  • Kamal Pasha Jafree ৭ মার্চ, ২০২৩, ৮:৩০ এএম says : 0
    জালেম সরকারের জন্যই দেশের এই দুর অবস্থা ।
    Total Reply(0) Reply
  • Umme Habiba ৭ মার্চ, ২০২৩, ৮:৩১ এএম says : 0
    জুলুম করে সরকার,তার ফল ভোগে গরীব কৃষক
    Total Reply(0) Reply
  • Umme Habiba ৭ মার্চ, ২০২৩, ৮:৩১ এএম says : 0
    জুলুম করে সরকার,তার ফল ভোগে গরীব কৃষক
    Total Reply(0) Reply
  • Yeasin Ahmed ৭ মার্চ, ২০২৩, ৮:৩১ এএম says : 0
    অবৈধ সরকারের এসব দেখার সময় আছে? তারাতো ব্যস্ত বিরুধী মত দমনে।
    Total Reply(0) Reply
  • Yeasin Ahmed ৭ মার্চ, ২০২৩, ৮:৩১ এএম says : 0
    অবৈধ সরকারের এসব দেখার সময় আছে? তারাতো ব্যস্ত বিরুধী মত দমনে।
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: হুমকিতে খাদ্য নিরাপত্তা
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ